

হলিউডের ইতিহাসে যে কজন শিল্পী অভিনয়ের পাশাপাশি একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ইভা মেরি সেইন্ট ছিলেন তাদেরই একজন। দীর্ঘ সাত দশকের অভিনয়জীবনে অস্কার, এমিসহ নানা সম্মাননা অর্জনের পাশাপাশি অসংখ্য কালজয়ী সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি জানান দিয়েছেন তিনি। সেই কিংবদন্তি অভিনেত্রী আর নেই। ১০২ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ইভা মেরি সেইন্ট। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন মুখপাত্র জেফ স্যান্ডারসন। তিনি জানিয়েছেন, বার্ধক্যজনিত কারণেই মৃত্যু হয়েছে এই অভিনেত্রীর।
ইভা মেরি সেইন্টের চলচ্চিত্রযাত্রার শুরুটা হয়েছিল এমন এক সিনেমা দিয়ে, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে ইলিয়া কাজানের ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। প্রথম সিনেমাতেই মার্লন ব্র্যান্ডোর বিপরীতে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। শুধু প্রশংসাই নয়, সেই অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে অভিষেকেই সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন।
শুরুতেই পাওয়া সেই সাফল্য তার ক্যারিয়ারকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। পরের বছরগুলোতে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান পোক্ত করেন তিনি। অ্যালফ্রেড হিচককের ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এ ক্যারি গ্র্যান্টের বিপরীতে রহস্যময় ডাবল এজেন্টের চরিত্রে দেখা যায় তাকে। সিনেমাটি তাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে।
এরপর ‘এক্সোডাস’ ও ‘অল ফল ডাউন’-এর মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেন ইভা মেরি সেইন্ট। পল নিউম্যান, ওয়ারেন বিটির মতো তারকাদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিয়েও নিজের অভিনয় দক্ষতায় আলাদা করে নজর কাড়েন তিনি। তার অভিনয়ের ব্যাপ্তি ও সংযত উপস্থিতি তাকে সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রীতে পরিণত করেছিল।
ক্যারিয়ারের এমন উজ্জ্বল সময়ে চাইলেই আরও অনেক বড় তারকা হয়ে উঠতে পারতেন ইভা মেরি সেইন্ট। তবে জীবনের এক পর্যায়ে পেশার চেয়ে পরিবারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সন্তান ও সংসারকে সময় দিতে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে কাজের পরিমাণ কমিয়ে আনেন। তবুও অভিনয় থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হননি কখনো।
বড় পর্দার পাশাপাশি টেলিভিশনেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই অভিনেত্রী। ১৯৯০ সালের মিনি সিরিজ ‘পিপল লাইক আস’-এ অভিনয়ের জন্য এমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পরও যখনই পর্দায় ফিরেছেন, দর্শকের কাছে তা হয়ে উঠেছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়।
২০০৬ সালে ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ সিনেমায় সুপারম্যানের পালক মা মার্থা কেন্ট চরিত্রে অভিনয় করে আবারও বড় পর্দায় আলোচনায় আসেন তিনি। তখন তার বয়স আশির কোঠায়। বয়স যে তার অভিনয়ের আগ্রহকে থামাতে পারেনি, সেটিই প্রমাণ করে পরবর্তী কাজগুলো। ‘উইন্টারস টেল’-এর পাশাপাশি ২০১৯ সালের ‘মারিয়েট ইন এক্সট্যাসি’তেও তাকে দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে।
১৯২৪ সালের ৪ জুলাই নিউ জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন ইভা মেরি সেইন্ট। শিক্ষকতা নিয়ে পড়াশোনা করলেও অভিনয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে টেনে নেয় মঞ্চে। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত অ্যাক্টরস স্টুডিওতে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় পেশাদার অভিনয়ের পথচলা, যা শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় হলিউডের অন্যতম সম্মানজনক অবস্থানে।
শুধু কর্মজীবনেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন এই অভিনেত্রী। পরিচালক জেফ্রি হেইডেনের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ৬৫ বছর। হলিউডের ঝলমলে কিন্তু অনেক সময় অস্থির ব্যক্তিজীবনের বিপরীতে তাদের দীর্ঘ সংসার ছিল ব্যতিক্রমী এক অধ্যায়।
অভিনয়ের সোনালী সময় পেরিয়ে বহু বছর পরও ইভা মেরি সেইন্টের নাম রয়ে গেছে চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু একজন অস্কারজয়ী অভিনেত্রীর জীবনাবসান হলো না, বিদায় নিলেন হলিউডের সেই প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি, যাদের অভিনয়ে একসময় রূপালি পর্দা পেয়েছিল নতুন ভাষা।
Leave a Reply