কেডিএ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ব্যয় তৃতীয় দফা সংশোধন করে চলতি বছরের ৯ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হয়। সভায় প্রকল্পটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কের কাজ কেন শেষ হয়নি, তা জানতে চেয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে সভা থেকে ফেরত পাঠানো হয় ২৮০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্পটি। সড়কের কাজ শেষ না হওয়া এবং গাফিলতি খুঁজতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য করা হয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে। এরপর চলিত বছরের ৪ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব সরেজমিন খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক পরিদর্শন করেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে খুলনা নগরীর রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে শিপইয়ার্ডের সামনে দিয়ে খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। মেয়াদকাল ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়। পরে তা বাড়িয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর প্রকেল্পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পরে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২০ সালের ২১ জুলাই ‘খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প আবার একনেকে অনুমোদন পায়। তখন প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। অনুমোদনের পর ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড এবং মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ দেয় কেডিএ।
একই বছরের ২০ জানুয়ারি কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স কাজ ফেলে রেখে লাপাত্তা হয়ে যায়।
কেডিএ সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালের আগস্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ও জামানতও বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নতুন করে ডেভেলপেমন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সেখানে সড়ক বিভাগের ২০২৩ সালের রেট কোড অনুযায়ী ২৮০ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়। নতুন প্রকল্পে সংযোগ সড়ক পুরোটা ঢালাই করে করা হবে বলে জানানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় ২০ বছর ধরে এই শিপইয়ার্ড সড়ক বেহাল দশা অবস্থায় আছে। কেডিএ রাস্তা সম্প্রসারণ করে কাজ সম্পন্ন না করেই দীর্ঘদিন এভাবে রেখে দিয়েছে। এ অবস্থায় বর্ষা মৌসুমে গর্ত আর কাদা এবং শুকনা মৌসুমে ধুলাবালিতে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের ব্যবসা-বাণিজ্যতেও পড়েছে ভাটা। পণ্য আনা-নেওয়া করতে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। সড়কে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
শিপইয়ার্ড সড়ক সংলগ্ন স্থানীয় ব্যবসায়ী লিটন জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে দেখছি কাজ শুরু হয়েছে। মাহাবুব ব্রাদার্স শুনেছি কাজ পেয়েছে। কিন্তু তারা পুরো ফাঁকিবাজি কাজ করেছে। আমরা ৬-৭ বছর ধরে রাস্তার সমস্যায় ভুগছি। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় গর্ত। ধুলাবালির কারণে দোকানে বসার উপায় নেই। বড় বড় গর্তের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কয়েকবার ইজিবাইক উল্টে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা আহত হয়েছে।’
সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুত রাস্তার কাজটি সম্পন্ন করুন। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে এলাকাবাসী মুক্তি দিন।’
স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘এক বছরের কাজ এক যুগেও শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এটা ব্যর্থতা ছাড়া কিছু না। বড় বড় সড়কের কাজ হয়। কিন্তু সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা কী দোষ করল! কেডিএ না পারুক অন্য কোনো দপ্তরকে কাজটা দিয়ে দিক। তবুুও কাজটি দ্রুত শেষ হোক।’
একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইজিবাইকচালক রেজাউল মিয়া। তিনি বলেন, ‘কাদায় ইজিবাইক চলাতে গেলে উল্টে যায়, সাধারণ মানুষ পিছলে পড়ে। বড় ট্রাকও উল্টে যায়। ইজিবাইক এ রাস্তায় চালাতে চালাতে এখন লক্কর-ঝক্কর অবস্থা।’
খুলনা দুদক সূত্রে জানা যায়, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকেল্পর কাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টম্বর খুলনা সমিন্বত জেলা কার্যালয়ের সাবেক সহকারী পরিচালক রকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম সরেজমিন অভিযান পরিচালনা করে। পরে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। রকিবুল ইসলাম বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেডিএর একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স বিল তুলে নিয়েছে। পরে প্রকল্প কর্মকর্তারা কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি।’
তিনি আরও বলেন, গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ৪০৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেডিএর ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেডিএ চেয়ারম্যানকে এবং কেডিএতে প্রেষণে কর্মরত তিন উপসিচবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে খুলনা উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের সদস্য (এস্টেট) মো. ইকবাল হোসেন (উপসচিব) আমার একুশকে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অ্যাডভান্স টেন্ডার করে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে একনেকে রিভাইজ অনুমোদন হলে টেন্ডার করা সম্ভব হবে। একনেকে অনুমোদন হলে কাজ সমাপ্ত হতে সর্বোচ্চ এক বছর সময় লাগবে।’
Leave a Reply