1. admin@dainikamarekush.com : amar123 :
  2. newsamarekush@gmail.com : md arif : md arif
  3. newsamarekush1@gmail.com : dainik staf1 : dainik staf1
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

কয়েকজনের স্বার্থ, নাকি শতকোটি টাকার শিল্প ও হাজারো কর্মসংস্থান?

একুশ ডেস্ক:
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৮৬ Time View

শিল্পাঞ্চল খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকারখানাগুলো এক এক করে বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রিসেন্ট ও প্লাটিনামসহ সকল রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল এবং নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হওয়ায় অগণিত শ্রমিক বেকার হয়ে অর্থসংকটে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এই স্থবিরতার মাঝেই কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তা নতুন শিল্প গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তবে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের অহেতুক নানা জটিলতা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে এসব সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এখন ধ্বংসের মুখে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন শ্রমিকরা, অন্যদিকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নকারী রপ্তানিমুখী শিল্পখাত আবারও হুমকির মুখে পড়ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়ে উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করছেন মালিকপক্ষ। কিন্তু এখানেও নানা প্রকার ভিত্তিহীন অভিযোগ করায় প্রশাসনের চাপে অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। খুলনা নগরীর আড়ংঘাটা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘ঈশানা ননওভেন ফেব্রিক্স লিমিটেড’ তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রায় আট শতাধিক স্থানীয় শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। যে এলাকাটি একসময় পরিত্যক্ত বিল ছিল, সেখানে আজ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং অধিকাংশ বাড়িতে নতুন বসতি গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার ৯০% সাধারণ মানুষ প্রতিষ্ঠানটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুধু কর্মসংস্থানই নয়, এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়ে এটি একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শতকোটি টাকার এই কারখানাটি প্রতিবছর বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটর না চালালে প্রতি ঘণ্টায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে বাধ্য হয়েই জেনারেটর চালাতে হয়।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের শব্দদূষণ হয়—এমন অভিযোগ এনে পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঁচ সদস্যের একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে অভিযোগকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন লিখিতভাবে জানান যে, ৩০ মার্চের অভিযোগপত্রে তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে এবং তারা ওই অভিযোগ করেননি। তাদের দাবি, মূলত ব্যক্তিগত জমি বিক্রির বিরোধকে কেন্দ্র করে কারখানাটির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। জেনারেটরের শব্দদূষণকে কেন্দ্র করে জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এর বিপরীতে কারখানাটি যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয় এবং উৎপাদনে ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও পরিবেশ অধিদপ্তরে পাল্টা আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শনে কারখানার পাশের বাড়িতে ৭৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা রেকর্ড হওয়ার কথা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে জেনারেটর সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে স্থাপন, শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তর ও পূর্বদিকের জানালা ও এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৪৫ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই উত্তর ও পূর্বদিকের জানালা-এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখা, সাউন্ডপ্রুফ ব্যারিকেড ও ককশিট ব্যবহারসহ শব্দ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। খোদ প্রধান অভিযোগকারী চিকিৎসক মনোরঞ্জনের ছেলেও স্বীকার করেছেন, “আমরা চাই না ফ্যাক্টরি এখান থেকে চলে যাক বা বন্ধ হয়ে যাক। এটি আমাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। তবে শব্দদূষণ আরেকটু কমাতে পারলে ভালো হয়। মালিকপক্ষ অনেক কাজ করেছেন, এতে প্রায় ৫০% শব্দ কমে এসেছে।”

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ আধুনিক জেনারেটর ও সাউন্ডপ্রুফ রুম তৈরি করতে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন। অভিযোগকারীরা পাশের যে জমির মালিক, তারা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি দাম চাওয়ায় জমি ক্রয় করা কোম্পানির জন্য প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আধুনিক সরঞ্জাম আমদানি করে ৪৫ দিনের মধ্যে জেনারেটর রুম তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা বাকের ঢালী বলেন, “আমি কী বলব, আমার বলার কোনো ভাষা নেই। জীবনে কোনোদিন ভাবিনি আমি হজে যেতে পারব। আমি জানিনা অথচ আমার ছেলে জয়নাল এই কোম্পানির বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। আমার সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে আমার ছেলের কিসের সমস্যা হবে।

একটি ফ্যাক্টরি চললে জেনারেটরও চালাতে হবে। বিদ্যুৎ না থাকলে তারা কী করবে? এই ফ্যাক্টরিতে আমাদের এলাকার শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
একসময় এই এলাকায় তেমন উন্নয়ন ছিল না। ফ্যাক্টরিটি হওয়ার পর এলাকার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নতুন নতুন বাড়িঘর হয়েছে, ভাড়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, জনবসতি বেড়েছে। এলাকার মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রার মানেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক মানুষ এখন বাড়ি ভাড়া দিয়ে আয় করছেন। তাই আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠানটি সচল রেখে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন সরকার বলেন, “এই অভিযোগের মূল কারণ শব্দদূষণ নয়, মূল কারণ হচ্ছে মালিককে চাপে ফেলে নিজেদের জমি চড়া দামে বিক্রি করা। জমি বিক্রিও করবে না, চড়া দাম হাঁকাবে, আবার পরিবেশ অধিদপ্তর দিয়ে ৪৫ দিনের আলটিমেটাম দেবে—যাতে বাধ্য হয়ে কোম্পানিটি পাঁচগুণ দামে জমি কেনে।”
অধ্যুষিত এলাকার এক দোকানদার বলেন, “সমস্যার চেয়ে উপকার আমরা ৯০% পাই, ১০% সমস্যা তো মেনেই নিতে হবে। অথচ একটি পরিবারের একাধিক ব্যক্তি নিজেদের ভেতর থেকে স্বাক্ষর করে পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিচ্ছে। হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকার কথা তারা ভাবছে না।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “যত্রতত্র যে কেউ পরিবেশ অধিদপ্তরে গিয়ে একটা ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই পরিবেশ অধিদপ্তর সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবে—এটা আসলে যুক্তিসঙ্গত নয়। যে ব্যক্তি বা সংগঠন অভিযোগ করছে, সেই সংগঠন বা সেই ব্যক্তি বা সেই প্রতিষ্ঠান অথেন্টিক কিনা, এর সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কিনা—এগুলো আগে খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে খুলনা থেকে যেমন শিল্প আজ হারিয়ে যেতে বসেছে, এরই মাঝে যে কয়েকটি ফ্যাক্টরি এখনো চালু আছে, তারাও বন্ধ করে চলে যেতে বাধ্য হবে। যে কেউ আবেদন করলেই সেই অভিযোগ আমলে নিলে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা সুবিধা পাবে এবং খুলনার শিল্পগুলো ধ্বংসের মুখে পড়বে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, “আমাদের কাছে একজন সাংবাদিক এসেছিলেন। তিনি এসে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান, তার আশপাশে কোনো নোংরা পরিবেশও নেই। সুতরাং আমরা তাঁকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযোগ করতে বলেছি।”

এ বিষয়ে ঈশানা ননওভেন ফেব্রিক্স (ইন্ডাঃ) লিমিটেড-এর জেনারেল ম্যানেজার জামিউল হাসান বলেন, “আমরা এলাকার মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করব না। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনামতো ৫০%-৬০% শব্দ কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক পযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে শব্দ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা করতে পর্যাপ্ত সময় ও প্রয়োজনীয় জায়গা লাগবে। জমিদাতারা যদি বাজারমূল্যে বা যৌক্তিক দামে জমি বিক্রি করেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের সময় দেয়, তবে আমরা শব্দদূষণ সমাধানের ব্যবস্থা করতে পারব।”

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ হারুন-অর-রশীদ বলেন, “আমাদের কাছে ফ্যাক্টরির পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক অভিযোগ এসেছে। তবে দুই পক্ষ মিলে সমাধান করলে দ্রুতই এর সমাধান সম্ভব। এত বড় একটি ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা ৪৫ দিনের সময় দিয়েছি, মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করা হবে। তবে কারখানাটির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বহাল।”

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category