
কাঁচামালের মূল্য বেড়েছে। সেইসঙ্গে পাওয়ার লুমের অসম প্রতিযোগিতা। সবমিলিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। তবে আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এই শিল্প। এ উৎসব উপলক্ষে প্রায় ৯০ হাজার পিস তাঁতের শাড়ি বিক্রির আশা করছেন ব্যবাসায়ীরা।
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের দিল্লিতে ইউনেস্কো ২০০৩ কনভেনশনের চলমান ২০তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্ষদের সভায় বাংলাদেশের ‘টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্প’কে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যমতে, একসময় টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও দেলদুয়ার উপজেলায় তাঁতের শাড়ি উৎপাদন হতো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ তাঁত মেশিন বন্ধ রয়েছে। অনেকে মেশিন বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে দিন দিন কমছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত কয়েক বছর ধরে এ ব্যবসায় মন্দাভাব যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা না থাকায় দিন দিন তাঁতের সংখ্যা কমছে। যেগুলো তাঁত রয়েছে, সেগুলোও অবস্থা ভালো নয়। তার মধ্যে বর্তমানে সুতার দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাওয়ার লুমের কারণে হ্যান্ডলুমের তৈরি শাড়ি কম চলে। হ্যান্ডলুমের শাড়ির দামও কিছুটা বেশি।
৫০ বছর ধরে তাঁতের কাজ করেন রঞ্জিত কুমার দাস। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, পূজা উপলক্ষে আমাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। আমি বর্তমানে জামদানি শাড়ি তৈরি করছি। এটি তৈরি করতে প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লাগে। এতে মজুরি পাওয়া যায় আড়াই হাজার টাকা। আগের মতো এ পেশায় লাভ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বর্তমানে বাজারে সূতার দাম বেশি। আগের তুলনায় মেয়েরা শাড়ি কম পড়ছে বলেও জানান তিনি।
২৫ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সুধীর চন্দ্র দাশ। তিনি হাফসিল্ক শাড়ি তৈরি করেন। আলাপকালে বলেন, ‘সপ্তাহে ৪-৫টি শাড়ি তৈরি করতে পারি। একটি শাড়ি তৈরি করতে দুই দিন সময় লাগে। প্রতিপিস শাড়ি তৈরি করলে মজুরি পাওয়া যায় ৭০০ টাকা এই টাকা দিয়ে কি সংসার চালানো সম্ভব? একটি ধানক্ষেতের কামলার জনের (পারিশ্রমিক) দাম এর চেয়ে বেশি।’
ধীরের পাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাওয়ার লুমের কারণে বর্তমানে তাঁতের শাড়িতে আরও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। পাওয়ার লুমে দিনে ৮-১০ পিস শাড়ি তৈরি করা যায়। আর একটি নিখুঁত তাঁতের শাড়ি তৈরি করতে অন্তত দুই দিন সময় লাগে।’
ছানোয়ার হোসের নামের এক তাঁত শ্রমিক আক্ষেপ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে প্রচুর তাঁতের শাড়ি চলত। এখন আর সেই দিন নেই। মজুরি কম থাকায় নতুন করে কেউ এই কাজে আসতে চায় না। ধান কাটলে মজুরি পাওয়া যায় ৮০০ থেকে হাজার টাকা। কিন্তু দুইদিন সময় লাগে একটি তাঁতের শাড়ি বানতে। তবুও ধান কাটার শ্রমিকের সমান মজুরি পাওয়া যায় না। আমাদের মজুরি বাড়ানো হলে পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে চলতে পারব।’
যে কোনো অনুষ্ঠানেই বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ শাড়ি। এর মধ্যে আবার তাদের টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ির প্রতি রয়েছে আলাদা টান। তাই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবারও টাঙ্গাইল শাড়িতে এসেছে বাহারি ডিজাইন আর নতুনত্ব।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলে দলে ক্রেতারা শাড়ি কিনতে ভিড় করছেন টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লি ও জেলা শহরের শোরুমগুলোতে। স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের জন্য এবং প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য পছন্দের শাড়ি কিনছেন ক্রেতারা।
একটি শাড়ির দোকানে কথা হয় মৃনাল কান্তি রায়ের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজে বলেন, ‘পূজা উপলক্ষে স্ত্রীর জন্য তাঁতের শাড়ি কিনেছি। মেয়ের জন্যও আরেকটি কিনব। দাম কমই মনে হচ্ছে। টাঙ্গাইল শাড়ির মান ও গুণ খুবই ভালো।’
শহরের থানা পাড়ার বাসিন্দা গৃহিণী মনিকা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে কোনো দিবসে তাঁতের শাড়ি আমার প্রথম পছন্দ। এতে নিখুঁত কারুকাজ থাকে। পড়ে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ঋণ দিয়ে এ শিল্পকে ওঠানো সম্ভব নয়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্থলপথে টাঙ্গাইল শাড়ির রপ্তানি ঠিক রাখতে হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই সুতার দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ ভাগ। এ সমস্যারও সমাধান জরুরি।’
টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক পলাশ বসাক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৮০-৯০ হাজার পিস শাড়ি বিক্রির আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ শাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। তবে এ পেশায় সরকারের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
Leave a Reply