
ইট-পাথরের দেওয়াল আর যান্ত্রিক ব্যস্ততায় যখন পুরো রাজধানী হাঁসফাঁস করে, তখন মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড পার্ক ও পার্কসংলগ্ন খেলার মাঠটি যেন নগরবাসীর জন্য এক টুকরো স্বস্তির নাম।
আধুনিক নকশা, স্থাপনা, পরিকল্পিত সবুজায়ন, খেলার মাঠ এবং সুবিন্যস্ত ওয়াকওয়ের ছোঁয়ায় এটি এখন এলাকাবাসীর প্রতিদিনের ক্লান্তি মেটানোর নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মোহাম্মদপুর ইকবাল রোড পার্ক মাঠ সরেজমিনে ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বললে এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন তারা।
সরেজমিনে পার্কটি ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকের প্রশস্ত সড়কে লোহার গ্রিলের বেষ্টনীর মাঝখানে সবুজ ঘাসের চাদরে মোড়ানো চোখ জুড়ানো খেলার মাঠ। মাঠটির চারপাশের নান্দনিক গাছপালা আর সুপরিচ্ছন্ন ওয়াকওয়েতে বয়স্করা স্বস্তিতে হাঁটাহাঁটি করছেন। তবে একই সময়ে খেলাধুলা চললেও ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে চলা মানুষের নিরাপত্তায় খেলার মাঠটির চারিদিকে রয়েছে আরও একধাপের লোহার বেষ্টনী।
বেষ্টনীর পাশ দিয়ে ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে চলতেই দেখা মেলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। অনেক গাছে চোখে পড়ে রং বেরঙের ফুল। এছাড়া কিছুদূর পরপরই বসার জন্য নির্দিষ্ট নান্দনিক বেঞ্চ। এছাড়া একপাশে শিশুদের খেলাধুলা-বিনোদনের স্থান। কংক্রিটের তৈরি সুবিশাল গেটটি যেন মুগ্ধ করে পার্কটিতে আসা মানুষজনকে।
ইকবাল রোডের এক বাসিন্দার ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে চাকরি করেন মাহবুব। মালিককে অফিসে আনা-নেওয়ার কারণে অবসর সময়ে প্রায়ই পার্কটিতে সময় কাটে তার। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার পার্কে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।
কথা হলে মাহবুব বলেন, ‘সাজানো গোছানো একটা পার্ক। প্রায় প্রতিদিনই পার্কে আসা হয়। পাশেই ম্যাডামের বাসা। ম্যাডাম বাসায় গেলে আমি সাধারণত পার্কে বসে সময় কাটাই। নিরিবিলি পরিবেশে বসে থাকতেও ভালো লাগে। গাড়ির মধ্যে বসে থাকলে এসি ছেড়ে বসে থাকতে হয়। তাই ম্যাডামকে নামিয়ে দিয়ে আমি পার্কে বসে থাকি। বাচ্চারা খেলা করে, আমি দেখি।’
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী এশাকে নিয়ে পার্কে এসেছেন তার মা আসমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘সুযোগ পেলেই বাচ্চাকে নিয়ে পার্কে আসি। বাচ্চা খেলাধুলা করে, আমি হাঁটাহাঁটি করি। এতে একদিকে বাচ্চারও মানসিক বিকাশ হচ্ছে, অন্যদিকে আমারও একটু হাঁটাহাঁটি হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণত যেদিন সারাদিন বাসায় আবদ্ধ থাকি সেদিন মন-মেজাজ ভালো লাগে না। ঠিকঠাক ঘুমও হয় না। তাই পাশেই বাসা হওয়ার কারণে নিয়মিত আসা হয়। পার্কের পরিবেশটা ভালো হওয়ায় দেখা যায়, যেদিন দিনের বেলা আসতে পারি না সেদিন সন্ধ্যার দিকেও মাঝেমধ্যে হাঁটতে আসি।’
মাঠেই খেলাধুলা করছিলো স্কুলছাত্র রবিন হাসান। সে বলে, ‘আমরা প্রতিদিনই মাঠে খেলাধুলা করি। সাধারণত স্কুল ছুটির পর যার যার কাজ শেষ করে খেলতে আসি। সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলাধুলা চলে, তারপর কিছুসময় বসে সবাই আড্ডা দিয়ে যে যার যার বাসায় ফিরে যাই।
পার্কে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, আমাদের পার্ক সপ্তাহে ৭ দিনই খোলা থাকে। ভোরবেলা থেকে শুরু হয়ে রাত ১১টা পর্যন্ত পার্কে মানুষ থাকে।
ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলার জন্য পার্কটির কিছুদূর পরপর রয়েছে ডাস্টবিন। এছাড়া কিছুদূর পরপর ইকবাল রোড পার্ক ও ফিল্ড ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ সংবলিত বোর্ড চোখে পড়ে। যেখানে বলা রয়েছে, ‘পার্কের সৌন্দর্য রক্ষার্থে ফল, পাতা ছিঁড়বেন না। মাঠ ও পার্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে কোনো প্রকার খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকবেন।’
এদিকে পার্কটির প্রধান ফটকে প্রবেশের আগেই দেখা মিলবে মাঠ ও পার্কটি ব্যবহারের সময়সূচি ও নিয়মাবলি। সেখানে বলা হয়, মাঠটির গেট বেলা ১১টা থেকে ২টা এবং বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা (মাগরিবের আজান) পর্যন্ত খোলা থাকবে। আর পার্কটি সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খোলা এবং এরপর মেইনগেট বন্ধ থাকবে।
নিয়মাবলিতে বলা হয়, মাঠে স্পাইক বুট পরে খেলা নিষেধ। ওয়াকওয়েতে সাইকেল চালানো নিষেধ। খাবার নিয়ে মাঠে ও পার্কে প্রবেশ নিষেধ। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি পরিহারের জন্য খেলোয়াড়দের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর মাঠে রক্ষিত রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে। মাঠে ও পার্কে ধূমপান নিষেধ। স্কুল/কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মাঠে ও পার্কে প্রবেশ নিষেধ। পোষা প্রাণী নিয়ে মাঠে ও পার্কে প্রবেশ করা যাবে না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply