1. admin@dainikamarekush.com : amar123 :
  2. newsamarekush@gmail.com : md arif : md arif
  3. newsamarekush1@gmail.com : dainik staf1 : dainik staf1
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

খুমেক হাসপাতাল • দালাল নির্ভরশীল ছোট ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক, বড়দের রয়েছে প্রতিনিধি

প্রধান প্রতিবেদক:
  • Update Time : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৪৯ Time View

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (খুমেক) ঘিরে গড়ে উঠেছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের এক রমরমা বাণিজ্য। শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই টেস্ট বাণিজ্য বছরের পর বছর ধরে করলেও যেন থামানোর কেউ নেই। রোগীই যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে হাসপাতালটিতে।

হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০০-১৭০০ রোগী চিকিৎসা নেন। এসব রোগী ঘিরে সক্রিয় প্রায় দেড়শ দালাল। হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিতে এই দালাল চক্র মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। এসব দালালদের ওপর নির্ভর করে ছোট ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে বড় পর্যায়ের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রয়েছে বেতনভুক্ত প্রতিনিধি।

অন্যদিকে চিকিৎসকরাও স্লিপের পেছনে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নম্বর লিখে দেন। প্রায় এক মাস খুমেক হাসপাতাল পর্যবেক্ষণে রেখে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনুসন্ধানেও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে মেডিকেল টেস্ট সংক্রান্ত অনিয়মের একাধিক তথ্য-প্রমাণ।

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, বর্তমানে নগরীতে অনুমোদিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২৯৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন করছে না প্রায় ২০৭টি প্রতিষ্ঠান। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অন্যদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৫০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনিক সেন্টার রয়েছে। যার মধ্যে অনুমোদন নেই ৩৭টি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। আর যেগুলোর অনুমোদন আছে তার অধিকাংশের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্র। এছাড়া প্রায় শতাধিক ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার শুধুমাত্র অনুমোদনের আবেদন দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম।

সরকারি হাসপাতালে দেওয়া টেস্টের স্লিপের সূত্র ধরে এবং বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা যায়, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সরকারি ডাক্তারদের নামসহ সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে অধিকাংশ চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোগী এলে কল করলেই চিকিৎসক চলে আসেন। আবার একই চিকিৎসকের নাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে।

সম্প্রতি সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে খুমেক হাসপাতালের উলটো দিকে ডাক্তারপাড়া এলাকায় আছে ১৩টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শান্তিধাম মোড় এলাকা জুড়ে আছে আরও ২০টি প্রতিষ্ঠান। ১ কিলোমিটার হিসেবে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগ ও খুমেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ঘিরে টেস্ট বাণিজ্য অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। খুলনা বিভাগীয় শহর হওয়াতে আশপাশের অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন। প্রায় প্রতিদিন গড়ে ১৫০০-১৭০০ রোগী আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে চিকিৎসা নেন। খুমেক হাসপাতালে এখন গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি হয়। কিন্তু হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ অজ্ঞাত কারণে দুর্বল হয়ে আছে। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বেসরকারি চিকিৎসা খাতকে প্রমোট করছে। এর লাগাম টেনে ধরা এতো সহজ না।

তাদের ভাষ্য, ‘হাসপাতালের আনসার সদস্যদের সঙ্গে দালালদের সখ্যতা রয়েছে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট। বেসরকারি বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসা কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের কমিশন দেয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে ১০-১৫ হাজার টাকাও ‘অনারিয়াম’ দিয়ে যায়। আর ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে মাসের শেষের দিকে একটা অ্যামাউন্ট পাঠিয়ে দেয়। টেস্ট বাণিজ্যের বিষয়ে এর বাইরে আর কিছু বলা সম্ভব না।’

খুমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালের টেস্ট বাণিজ্যে দুই ধরনের চক্র সম্পৃক্ত। একটি চক্র বড় প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে। তারা ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টেস্ট স্লিপ করিয়ে নেয় নিজেদের প্রতিষ্ঠানে এবং সার্জারির রোগীদের কম খরচে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে ভর্তি করে। অন্যদিকে ভাসমান দালাল চক্র আউটডোরের রোগীদের বাইরে নিয়ে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কমিশনের বিনিময়ে নিয়ে যায়। এরা নামমাত্র টেস্ট করিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মোল্লাহাটসহ আশপাশের অঞ্চল থেকেও খুলনায় আসেন। অনেকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। আর এই দুই চক্রকে হাসপাতালে থাকা অসাধু চিকিৎসকরা কমিশনের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যানারে শেল্টার দিয়ে রাখেন।

খুলনার তেরখাদা থেকে খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোখসানা পারভিন বলেন, ‘কোমরে ব্যথা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। প্রায় তিন বছর কোমরে সমস্যা। প্রথম দিকে ওষুধ খেয়ে কম ছিল। এখন সমস্যা বেড়েছে। তবে গেল যে কয়বার ডাক্তার দেখাতে এসেছি ৫-৬ হাজার টাকার মেডিকেল টেস্ট করতে হয়েছে। এবারো টেস্ট করানো লাগবে। সব টেস্ট আবার হাসপাতালে হয় না বলে প্যাথলজি থেকে বললো। ওখান থেকে একজন লোক জেনারেল ডায়গনিক সেন্টারের কার্ড ধরিয়ে দিয়েছে। সেখান থেকে টেস্ট করতে হবে এখন।’

বটিয়াঘাটা থেকে আসা এক ভর্তি রোগীর ছেলে কামাল মোল্যা বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। এই জায়গার একজন স্যার টেস্টের জন্য বলেছেন। একটা স্লিপের পেছনে টেস্টের নাম লিখে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ও নম্বর লিখে দিয়েছেন। নম্বরে কল দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের লোক বললো ঘণ্টা খানেক পর তিনি আসবেন স্যাম্পল নিতে।’

আউটডোরে আসা আসমা বেগম বলেন, ‘এলার্জির জন্য চিকিৎসা নিতে এসেছি। চিকিৎসক সব শুনে ৪টি টেস্ট দিয়েছেন। হাসপাতালে শুধু সিবিসি টেস্ট হবে। তাও রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে। অন্যান্য টেস্টগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকজন লোক কম খরচে টেস্ট করা যাবে বলে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। আমি টেস্ট করাব না বলে বের হয়ে এসেছি।’

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার  বলেন, বিগত দিনে অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে খুলনার স্বাস্থ্য প্রশাসন চলেছে। তাদের হাত ধরেই বিগত দিনে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন হয়েছে। নতুন আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসকল বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অপসারণ করতে হবে। আর নতুন করে অনুমোদনতো দেওয়া যাবেই না। কিন্তু আইনে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা নেই। এ বিষয়টি কার্যকর করতে গেলে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে স্থাপন হয়ে গেছে তাদের আইনের আওতায় আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে জটিলতা নিরসন সম্ভব নয়।

টেস্ট বাণিজ্য নিয়ে তিনি বলেন, রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায় তখন এই সমস্যা হয়। এটার গোড়ায় গলদ। খুলনার বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের ঢিলেমির কারণে এই অসাধু চক্রের বাণিজ্য চলছে। শৃঙ্খলার অভাব এবং অসাধু চক্রের কারণেই দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে যা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এখানে এখন জগাখিচুড়ি অবস্থা। কেউ কারো দায়িত্ব পালন সঠিকভাবে করছে না। রোগী এখন পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে এই সমস্যা নিরসন করা সম্ভব।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, দালালদের প্রতিহত করতে আমরা হাসপাতালে একটি কমিটি করে দিয়েছি। তাদের এটি দেখার কথা। তবে আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে দালালদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দালালরা তো আমাদের চেনে। অভিযান চালালে তারা পালিয়ে যায়। এছাড়া আমরা বিভিন্ন সময় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। তাদের জরিমানা করা হয়েছে এবং গ্রেফতার করাও হয়েছে। কিন্তু ছাড়া পেয়ে আবার তারা পুনরায় কোনো না কোনোভাবে চলে আসে।

তিনি আরও বলেন, ইনডোরের অভিযোগের বিষয়ে কেউ এখনো অভিযোগ করেননি। আমাদের হাসপাতালে যেসব মেডিকেল টেস্ট হয় তার সিল টিকিটে আছে। তবে কিছু কিছু টেস্টের সুযোগ হাসপাতালে নেই। তারপরও অভিযোগের বিষয়টি আমরা দেখব।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন  বলেন, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয়ে মৌখিকভাবে নির্দেশনা পেলেও লিখিতভাবে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। কিন্তু খুব শিগগিরই নির্দেশনা চলে আসবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category