
অটোরিকশাচালক সুমনই তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন
আট কিলোমিটারের পথ, ঘুরেছেন ৩০ কিলোমিটার
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরে তাজমীন। রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে। পরে একটি দোকানে মোবাইল ফোন চার্জ দেয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল তাজমীন।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুমনের অটোরিকশায় ওঠে সে। দর-কষাকষির পর ৩০০ টাকায় বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হন চালক। কিন্তু গন্তব্যের দিকে না গিয়ে তিনি অন্য সড়ক ধরে নির্জন এলাকার দিকে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে বিজরা বাজারের দিকে যান। পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুরের একটি ফসলের মাঠের কাছে পৌঁছান। এ পথে মোট দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, পদুয়ার বাজার থেকে তাজমীনের বাসায় যেতে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাঁকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছেন, অটোরিকশা চলার সময় তাজমীন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, কিশোরী কোনো পর্যায়ে বিপদ বুঝতে পেরেছিল কি না কিংবা সাহায্য চাওয়ার সুযোগ হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবাকে লাইভ লোকেশন
তদন্তে উঠে এসেছে, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবাকে একটি লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। তবে ঘুমিয়ে থাকায় তখন সেটি দেখতে পাননি তার বাবা। ভোরের দিকে লোকেশনটি দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন তিনি। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করছিল। পরে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন বাবা।
তাজমীন ঠিক কী পরিস্থিতিতে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল, সে সময় সে বিপদের আশঙ্কা করছিল কি না কিংবা লোকেশন পাঠানোর পর কী ঘটেছিল-সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ওই সময় পর্যন্ত তার কাছে মোবাইল ফোনটি ছিল বলে পুলিশের দেওয়া সময়রেখা থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তাজমীন যদি ঘটনাস্থলে বা এর আগে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করত, তাহলে হয়তো এমন মৃত্যু দেখতে হতো না।
যেভাবে ঘটেছে বলে দাবি পুলিশের
পুলিশের দাবি, নির্জন জায়গায় পৌঁছানোর পর তাজমীন পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকাতে ধস্তাধস্তি করেন। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি। এরপর ধানখেতে নিয়ে কিশোরীকে উপুড় করে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গামছা ছিল। কাছাকাছি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ির ভেতরে কাপড়চোপড় এবং পাশে একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়।
ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। ধর্ষণ হত্যার আগে, নাকি পরে ঘটেছে, সে বিষয়েও পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি।
সিসিটিভি ফুটেজে অটোরিকশায় তাজমীন
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফুটেজে তাকে পেছনের বাঁ পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিলেন কি না, তা নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তুললে পুলিশ জানায়, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
তবে দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় অটোরিকশায় অন্য কেউ উঠেছিলেন কি না, কোনো পর্যায়ে চালককে কেউ সহায়তা করেছিলেন কি না এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।
কক্সবাজার যাওয়া থেকে কুমিল্লায় ফেরা
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমীন। পরে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পায় পুলিশ। কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাসে বুধবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ফেরে সে।
পুলিশ জানিয়েছে, ৪ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তাজমীন কোথায় ছিল, কীভাবে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছে এবং কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানিয়েছিলেন, তাজমীন বুধবার রাতে বাড়ি ফিরবে বলে ওই দিন বিকেলে পরিবারকে জানিয়েছিল।
হত্যার পর আইফোন নিয়ে চট্টগ্রামে যান সুমন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে তাজমীনের আইফোন নিয়ে চলে যান সুমন। পরে কচিকাটা মসজিদের কাছে একটি পুকুরে গোসল করেন। এরপর অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বাখরাবাদ এলাকা থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাজমীনের শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি, দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার কারণ, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক ঘটনা এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
Leave a Reply