রাতে পরিবারের সবাই ঘুমাতে গেলেন। সকালে গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে একে একে হাসপাতালে ভর্তি হলেন সবাই। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন কেউ কেউ। কোনো ঘটনায় নিভে গেল পুরো পরিবারের প্রাণ। নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজ থেকে একের পর এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এমন করুণ পরিণতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গত ছয় মাসে এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন।
সবশেষ সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ চারজনের সবাই মারা গেছেন। গত ১০ অক্টোবর রাতে একটি বাড়িতে ঘুমানোর সময় দগ্ধ হন পোশাকশ্রমিক রোজিনা, তার স্বামী শরিফ, ভাই রিয়াজ ও রনি। তাদের শরীরের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করার পর একে একে চারজনের মৃত্যু হয়।
একই দিন ফতুল্লার একটি কেমিকেল গোডাউনে আগুনে দগ্ধ হন দুই শ্রমিক আনোয়ার ও শামসুল। নগরীর দেওভোগ আখড়ার মোড় জিউস পুকুরপাড় এলাকায় একটি বাড়িতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন শিখা রানী, মনা আচার্য ও তার মা আশা রানী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনা আচার্য ও শিখা রানী।
এর আগে ৭ আগস্ট বন্দরের কুড়িপাড়া-চাপাতলী এলাকার একটি টিনশেড বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন একই পরিবারের তিনজন। তাদের মধ্যে আট বছরের শিশু মারুফ ৮ আগস্ট, তার মা বিউটি ১০ আগস্ট এবং বাবা রাজমিস্ত্রি মাইদুল ১১ আগস্ট মারা যান। কাজের সন্ধানে প্রায় এক বছর আগে তারা নাটোর থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন।
গত ১০ মে ফতুল্লার গিরিধারা আবাসিক এলাকার একটি বহুতল ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দগ্ধ হন একই পরিবারের পাঁচজন। পরে একে একে মারা যান সবজি বিক্রেতা কালাম, তার স্ত্রী সায়মা, ছেলে মুন্না, মেয়ে মুন্নি ও ছোট শিশু কথা।
এছাড়া ১৩ মে সোনারগাঁয়ের জেরা মেঘনাঘাট পাওয়ার প্লান্টে সিলিন্ডার গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ ১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে শংকর নামে একজন মারা যান। ১১ মে ফতুল্লার লাকীবাজারে একটি বাসায় আগুনে দগ্ধ আব্দুল কাদের ও তার তিন ছেলের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন পর মারা যান আব্দুল কাদের ও রাকিব।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে নারায়ণগঞ্জে গ্যাসলাইন ও সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে অন্তত ২০৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৯৬টি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস সরাসরি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। বাকি ১০৯টি ঘটনায় স্থানীয়রা প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৭১টি, যার মধ্যে বিস্ফোরণজনিত ঘটনা ছয়টি।
তবে এসব ঘটনায় আহত ও নিহতের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই। কারণ দগ্ধদের অনেকে পরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যায়। পাইপলাইনে ফুটো হলে সাময়িকভাবে মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান মেলে না। পুরোনো পাইপলাইন, অবৈধ সংযোগ, সিলিন্ডারের ত্রুটি, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও অসচেতন ব্যবহারের কারণে আবাসিক ভবন থেকে শিল্পকারখানা- সবখানেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু বলেন, গ্যাস লাইনের লিকেজ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া অবৈধ সংযোগগুলো যে যার মতো নিয়েছেন।
তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের ডিএমডি রাজীব কুমার সাহা বলেন, ত্রুটিপূর্ণ লাইন মেরামত নিয়মিত কাজের অংশ। সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ হাজার লিকেজ শনাক্ত ও মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো নারায়ণগঞ্জে এ কার্যক্রম চালানো হবে। কাজ শেষ হলে গ্যাস লিকেজ কমবে বলে আশা করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা যাবে না। দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্ধ ঘরে গ্যাস জমে থাকার পর চুলা জ্বালানো বা সুইচ টেপার কারণে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাসার ভেতরে ঘটে যাওয়া গ্যাস দুর্ঘটনাগুলোর ধরন প্রায় একই। রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমানোর পর সকালে না খুলেই চুলা ধরানো বা সিগারেটের জন্য লাইটার জ্বালানোর ঘটনায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘরে থাকা মানুষ দগ্ধ হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, গ্যাস দুর্ঘটনাগুলো তাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে তিতাস, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিতাসকে লাইনের ত্রুটি মেরামতের জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি জনসাধারণকে সচেতন করার কাজও চলছে।
<p style="text-align: center; ">সম্পাদক ও প্রকাশক :মনোয়ারা জাহান। প্রধান সম্পাদক : লে: কমান্ডার কে এম জাহাঙ্গীর আলম বিএন (অবঃ), বার্তা সম্পাদক : আরিফ বিল্লাহ। সম্পাদক কর্তৃক ৪৬, বড় মির্জাপুর রোড থেকে প্রকাশিত, অনির্বাণ প্রেস এন্ড পাবলিকেশন , বড় মির্জাপুর রোড, খুলনা থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, শামসুর রহমান রোড, খুলনা। ০১৭১২-২৫৩৫১৯ / newsamarekush@gmail.com</p>
দৈনিক আমার একুম